শিক্ষকতা পেশা হলো পৃথিবীর সমুদয় পেশার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠ। এ মহৎ পেশার দরুন একজন শিক্ষক মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকেন। কালের আবর্তনে শিক্ষকদের প্রদত্ত অবদান ক্ষয় হয় না। তাদের পাঠদানের প্রতিদান প্রবহমান থাকে অনন্তকাল। তারা মরেও অমর। সওয়াবের ধারাবাহিকতায় শিক্ষকদের আত্মা শান্তি পায়

শিক্ষক হচ্ছেন ছাত্র গড়ার কারিগর। ছাত্রদের সুন্দর ভবিষ্যৎ জীবন নির্ভর করে শিক্ষক সমাজের ওপর। শিক্ষকের আন্তরিকতায় ও ভালোবাসায় ছাত্রের জীবন সুন্দর হয়। তাই ছাত্ররা স্বীয় শিক্ষককে আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তবে এ সম্মান অর্জনের প্রথম শর্ত হলো, শিক্ষককে আদর্শবান ও নীতিবান হতে হবে। কারণ শিক্ষকের স্বভাব দ্বারা ছাত্ররা প্রভাবিত হবে। ওই প্রভাবই ছাত্রজীবনের মূল উদ্দীপক। তাই একজন শিক্ষকের জীবনে শিক্ষকতার পাশাপাশি নৈতিকতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষককে বাবার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাই একজন শিক্ষকের ছাত্রের প্রতি বাবার মতো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সন্তানকে সুশিক্ষিত করার ব্যাপারে যে রকম বাবা-মাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, সে রকম শিক্ষককেও ছাত্রছাত্রীদের আদর্শ ও সভ্যতা শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে অভিভাবকদের রক্ষিত আমানত। এতে তাদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের খেয়ানত করা যাবে না। সবসময় শিক্ষার্থীদের সুন্দর ও আলোকিত জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে শিক্ষকদের কাজ করে যেতে হবে।

সদুপদেশ হতে হবে শিক্ষার প্রেরণা
ছাত্রছাত্রীরা জ্ঞান অর্জনের মহৎ লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষকের কাছে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটে আসে। কোরআন ও হাদিসে জ্ঞান অর্জনকারীদের মর্যাদার কথা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্বীনি জ্ঞান পিপাসুদের কখনও আশার বাণী থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না। একজন শিক্ষকের উচিত, শিক্ষর্থীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। সৎ উপদেশ দেওয়া। জ্ঞানার্জনকারীদের জ্ঞান অর্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। তাই শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের সন্ধানী হিসেবে গড়ে তোলা। কেননা ছাত্রছাত্রীদের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষকদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের প্রতি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। এছাড়াও অধুনা পৃথিবীতে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে যে সভ্যতার ছোঁয়া লেগেছেÑ এর মূল উৎস হলো ইসলামি শিক্ষা। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার পর মানুষ তোমাদের অনুসরণকারী হবে। দিগদিগন্ত থেকে লোক তোমাদের কাছে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করার উদ্দেশ্যে আসবে। যখন তারা তোমাদের কাছে আসবে তাদের সদুপদেশ বা দ্বীনের তালিম দেবে।’ (তিরমিজি : ২৮৬২)।

প্রতিটি সবক একাধিকবার পড়ানো সুন্নত
শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীদের দৈনিক পাঠদানকালে প্রতিটি সবক বারবার পড়িয়ে দেওয়া। এতে ছাত্রছাত্রীদের নিজের পড়া বুঝে নেওয়া সহজ হবে। কারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তিন শ্রেণির শিক্ষার্থী থাকেÑ তীক্ষè মেধাবী, মধ্যম মেধাবী ও মেধাহীন। তাই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বোঝানোর লক্ষ্যে প্রতিটি পাঠদান একাধিকবার বলা উচিত, যাতে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী উত্তমরূপে বুঝতে সক্ষম হয়। এ পাঠদান পদ্ধতির প্রবর্তক হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাজ্ঞানী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি সাহাবাদের সঙ্গে কথোপকথনকালে একই কথা পুনঃ পুনঃ তিনবার বলতেন, যাতে তাঁর কথা সহজে বুঝে নিতে পারে। আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এর স্বভাব ছিল, তিনি যখন কোনো কথা বলতেন প্রায় সময় পুনঃ পুনঃ তিনবার বলতেন, যাতে তাঁর কথা সবাই উত্তমরূপে বুঝে নিতে সক্ষম হয়। এভাবে তিনি কোনো সম্প্রদায়ের কাছে যেতেন আর তাদের সালাম করতেন, তখন সালাম করতেন তিনবার করে। (বোখারি : ৯৫)।

দ্বীনি শিক্ষাদানে শিক্ষকের গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পদ্ধতিতে পাঠ দান করা হয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে জাগতিক নিয়মে শিক্ষা প্রদান করা হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের পাঠ দান করা হয়। দুনিয়ার সমুদয় শিক্ষার মধ্যে সর্বোত্তম শিক্ষা হলো দ্বীনি শিক্ষা। এমনকি দ্বীনি শিক্ষা পাঠদানকারীকে সর্বোত্তম শিক্ষক বলা হয়েছে ইসলাম ধর্মে। যেমনÑ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে কোরআন মজিদ শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মীয় শিক্ষককে কখনও অবজ্ঞা করা যাবে না এবং তার সঙ্গে কোনো ধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণ শোভনীয় হবে না। এছাড়াও হাদিসে বলা হয়েছে একজন দ্বীনি শিক্ষকের মর্যাদা রাত জেগে ইবাদতকারী তাপসের চেয়েও বেশি।
হাসান বসরি (রহ.) থেকে মুরসাল সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুল (সা.) কে বনি ইসরাইলের দুজন লোকের ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তাদের একজন ছিলেন আলেম, যিনি শুধু ফরজ নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর বসে লোকদের দ্বীনি ইলম শিক্ষা দিতেন। আর অপর লোকটা ছিলেন আবেদ, যিনি সারাদিন রোজা রাখতেন এবং সারারাত নামাজ পড়তেনÑ এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে? প্রত্যুত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, যে আবেদ সারাদিন রোজা রাখে আর সারারাত নামাজে কাটায়, তার অপেক্ষা সেই আলেমের ফজিলত, যিনি শুধু ফরজ নামাজ আদায় করেন, অতঃপর বসে লোকদের দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেন তার তুলনায় এমন, যেমন আমার ফজিলত তোমাদের একজন সাধারণ লোকের ওপর। (দারামি)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.) কে লক্ষ করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ তায়ালা তোমার দ্বারা এক ব্যক্তিকে হেদায়াত দেন, তাহলে তা তোমার লাল উটের মালিক হওয়া অপেক্ষাও অধিক উত্তম।’
(বোখারি : ৩৭৪৮)।
পৃথিবীবাসীর জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ শিক্ষক
মানবজাতির মহান শিক্ষক হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সা.)। তিনিই একমাত্র মানবজাতিকে উন্নত জীবনপ্রণালির শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর অনুপম আদর্শই সব যুগের সব জাতির সর্বোত্তম জীবন গড়ার পাথেয়। প্রাক ইসলামি যুগের মানুষকে সভ্যতার শিক্ষা দিয়েছেন রাসুল (সা.)। তাঁর দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে জাহেলি যুগের অজ্ঞতা দূরীভূত হয়। মানবসমাজ মুক্তি পায় নারী নির্যাতন, জুলুম ও মদপানসহ সব ধরনের অন্যায়-অবিচার থেকে। মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীবাসীর জন্য আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ আদর্শ শিক্ষক। হাদিসে বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) বলেন, একদিন রাসুল (সা.) মসজিদে নববিতে সাহাবাদের দুটি মজলিসের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, উভয় মজলিস ভালো কাজে রত আছে। তবে একটি মজলিস অপর মজলিস অপেক্ষা উত্তম। এই যে মজলিসটি যারা দোয়ায় মশগুল আছে তারা অবশ্য আল্লাহকে ডাকছে এবং আল্লাহর প্রতি নিজেদের আসক্তি প্রকাশ করছে। আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাদের দানও করতে পারেন আবার চাইলে বঞ্চিতও করতে পারেন। আর এই যে অপর মজলিসটি, যারা ফিকহ বা দ্বীনি শিক্ষা চর্চা করছে এবং অন্য অনবহিতদের শিক্ষা দিচ্ছেÑ তারাই উত্তম। প্রকৃতপক্ষে আমিও একজন শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর তিনি এ শিক্ষানবিশ মজলিসের সঙ্গে বসে পড়লেন। (দারেমি)।

আদর্শ শিক্ষক দুনিয়ার সেরা দানবীর
মানবসমাজে সাধারণত যে ব্যক্তি বেশি পরিমাণে দানখয়রাত করে, সে ব্যক্তিই মানুষের কাছে দানবীর হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু ইসলামে তাকে সত্যিকারের দানবীর বলা হয়নি। কারণ অর্থ-সম্পদের দান বস্তগত সাহায্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে দানগ্রহীতা তা দ্বারা অন্যের দুঃখ-কষ্টে সহযোগিতা করতে পারে না। পক্ষান্তরে একজন শিক্ষক শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জীবনকে আলোকিত করে আবার সেই শিক্ষার্থী স্বীয় জ্ঞান দ্বারা অন্যের জীবনকে আলোকিত করতে সক্ষম হয়। শিক্ষকের অবদান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শিক্ষার্থীর জীবনপ্রবাহে ও মানবসমাজে চিরকাল অবিস্মরণীয় হয়ে থাকে। তাই একজন আদর্শ শিক্ষক দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দানবীর। তার সুশিক্ষা দানের ধারাবাহিকতায় সমাজ থেকে মূর্খতা বিতাড়িত হয়। মানবসমাজ ও রাষ্ট্র কলুষমুক্ত হয়, শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। হাদিসে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) একজন আদর্শ শিক্ষকের দুনিয়াবি সম্পদ না থাকলেও তাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দানবীর হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা বলতে পার কি, দানের দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা বড় দাতা কে? সাহাবারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক অবগত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘দানের দিক দিয়ে আল্লাহই হচ্ছেন সর্বাপেক্ষা দাতা। অতঃপর বনি আদমের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা বড় দাতা। আর আমার পর বড় দাতা হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করবে এবং তার প্রচার-প্রসার করতে থাকবে। কেয়ামতের দিন সে একাই দলবলসহ একজন আমির অথবা একটি উম্মত হয়ে উঠবে। (বায়হাকি)।
শিক্ষকতার প্রতিদান প্রবহমান
শিক্ষকতা পেশা হলো পৃথিবীর সমুদয় পেশার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠ। এ মহৎ পেশার দরুন একজন শিক্ষক মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকেন। কালের আবর্তনে শিক্ষকদের প্রদত্ত অবদান ক্ষয় হয় না। তাদের পাঠদানের প্রতিদান প্রবহমান থাকে অনন্তকাল। তারা মরেও অমর। সওয়াবের ধারাবাহিকতায় শিক্ষকদের আত্মা শান্তি পায়। কারণ একজন শিক্ষকের জ্ঞান দ্বারা অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর উপকার সাধিত হয়। এ উপকারই শিক্ষকের জন্য সদকায়ে জারিয়ার রোপিত বীজ।
এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন মানুষ মরে যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমলের সওয়াব বন্ধ হয় নাÑ ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. জ্ঞানÑ যার দ্বারা লোকের উপকার সাধিত হয়, ৩. সুসন্তানÑ যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম : ৪৩১০)।

31 total views, 1 views today