জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা রোধ করতে হলে অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রে ও দেশব্যাপী ইসলামি আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে সব স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে ধর্মীয় শিক্ষা আবশ্যকীয় করতে হবে। এতে মানবজীবনে মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা, আত্মপরিচয় বোধ অর্জন হবে। ফলে প্রতিষ্ঠিত হবে
আত্মহত্যামুক্ত নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন

ইসলাম সর্বজনীন বিশ্ব মানবতার সংবেদনশীল একটি নীতি-আদর্শের রূপরেখা। এ ধর্মের সুশীতল ছায়ায় রয়েছে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বিশ্ব মানবকল্যাণের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থাপনা। নম্র-ভদ্র, শান্তশিষ্ট, আদর্শনিষ্ঠ ও আত্মপরিচর্চা এ ধর্মের গুণগত বৈশিষ্ট্য। গতিময় কর্মময় জীবনের স্রোতধারায় ব্যাপক বাধাবিপত্তি, কষ্ট-গ্লানি, ক্রোধ-ক্ষোভকে নিবারণ করতে না পারলে মানবজীবনে তৈরি হয় দুঃখ-বেদনার করুণ ইতিহাস। সুশৃঙ্খল সাজানো জীবনে ঘটে ব্যাপক ছন্দপতন। তখন দিগদিগন্তে খেঁাঁজে আশার বাণী, যা কলুষিত আত্মাকে নির্মল করবে।
মানুষ যখন নিজেকে রাগ-ক্ষোভ, দুঃখ-বেদনার কাল-স্রোত থেকে সংযত, সংবরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তার মধ্যে বিরাজ করে মারামারি-কাটাকাটি, ফেতনা-ফ্যাসাদ, অত্যাচার-অনাচার, হত্যা, রাহাজানিসহ নানা অপরাধের চিন্তাচেতনা। এরূপ মুহূর্তে মানুষ নিজেকে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজটিও করে থাকে। তখন তার মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি আত্মবোধ, মনুষত্ব বলতে কিছুই থাকে না। তার মধ্যে তখন থাকে মানবতাহীন আত্মঘাতপূর্ণ চিন্তাচেতনা। ভুলে যায় নিজেকে, সে বুঝতে পারে না যে, আত্মহত্যা নামক জঘন্য কাজটি কেন করছে? কী লাভ হবে জীবনকে নিঃশেষ করে? এরূপ কঠিন রাগ-ক্ষোভের মুহূর্ত বয়ে আনে জীবনের মহাবিপর্যয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আত্মহত্যা থেকে পরিত্রাণের ব্যাপক পন্থা ও পথ নির্দেশিত হয়েছে।
আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমাদের কারও কোনো বিপদ বা কষ্ট হলে সে যেন মৃত্যু কামনা না করে। যদি কেউ এরূপ করতে চায়, সে যেন বলে হে আল্লাহ, তুমি আমাকে জীবিত রাখ যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত থাকা আমার জন্য কল্যাণকর এবং যখন আমার জন্য মৃত্যু কল্যাণকর, তখন আমাকে মৃত্যু দাও।’ (বোখারি : ৫৮৭৪)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লোককে কুস্তিতে হারিয়ে দেয় সে বাহাদুর নয়, বরং প্রকৃত বাহাদুর তো সেই, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বোখারি : ৪৭২৩)।
আত্মহত্যা করার অন্যতম আরও একটি কারণ হলো নেশা করা। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি রাগ, ক্ষোভ, ক্রোধের মধ্যে বিলীন হলে যেমন আত্মহত্যা সংঘটিত হয়, অনুরূপ নেশা করার দরুন মানুষ আত্মহত্যা করে। কারণ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায়। ২০১৩ সালের ১৬ আগস্টের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা, রাজধানীর চামেলীবাগে ঐশী রহমান নামে ১৯ বছরের মেয়ে নিজেদের বাসায় আপন বাবা পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না বেগমকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় হত্যা করে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের থেকে এরূপ অসামাজিক ও আত্মঘাতী কর্মকা- প্রকাশিত হওয়াটা স্বাভাবিক। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালা নেশাকে হারাম করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, প্রতিমা ও লটারি এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। তোমরা তা থেকে বিরত থাক। আশা করা যায় যে, তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে।’ (সূরা মায়েদা : ৯০)।
মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? এ প্রশ্নকে ব্যাপক বিশ্লেষণ ও গবেষণা করলে বহু কারণ আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑ
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য, যৌতুকের কারণে ঝগড়া-বিবাদ।
বাবা-মা ও ছেলে-মেয়ের মধ্যে মনোমালিন্য।
প্রেম-বিরহ, মিথ্যা অভিনয়ের ফাঁদে পড়া।
কারও কাছে পরাজয় বরণ করা।
ধনদৌলত আত্মসাৎ হয়ে ফতুর হওয়া।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ যন্ত্রণায় জীবনযাপন করা।
পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া।
ব্যক্তি জীবনে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আত্মবোধ সম্পর্কে অবহিত না হওয়া।
ধর্মীয় রীতিনীতি, আদর্শ সম্পর্কে অবগত না হওয়া।
জাতীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও নীতিনৈতিকতাপূর্ণ শিক্ষা না থাকা।
বর্তমানে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ২০টি কারণের মধ্যে একটি অন্যতম আত্মহত্যা। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। মানবতার জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ ২০১২ সালে বিশ্বে আত্মহত্যা করেছে ৮ লাখ মানুষ। এ সংখ্যা বর্তমান ২০১৮ সাল পর্যন্ত বেড়েই চলেছে। আর ‘বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর’ থেকে এক প্রতিবেদন অনুযায়ীÑ বাংলাদেশে ২০১১ সালে ৯ হাজার ৬৪২ জন, ২০১২ সালে ১০ হাজার ১০৮, ২০১৩ সালে ১৬ হাজার ২৮৮, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৭১৭ এবং ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৬২৩ জন আত্মহত্যা করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ীÑ ২০১১ সালে আত্মহত্যায় বাংলাদেশর অবস্থান ছিল ৩৪তম। বর্তমানে দশম স্থান অতিক্রম করছে। জাতীয় পর্যায় থেকে আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রচেষ্টা করা হলেও বিন্দু পরিমাণ সফল হওয়া যায়নি। বাংলাদেশ কেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের ২৮টি দেশ আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন কৌশল তৈরি করছে; কিন্তু তারা সফল হয়নি। অতি সম্প্রতি ব্রিটেন আত্মহত্যা প্রতিরোধে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করেছে, যা সে দেশে আত্মহত্যা কী রকম মারাত্মক রূপ নিয়েছে তার প্রমাণ বহন করে। সবাই নিরুপায়-নিস্তব্ধ হয়ে ব্যর্থতাকে বরণ করে নিয়েছে।
আত্মহত্যা রোধ একমাত্র ধর্মীয় নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব। কারণ ধর্মীয় নীতি-আদর্শ মানুষকে আত্মবোধ, আত্মমর্যাদা ও নৈতিকতা শিক্ষা দেয়। অনৈতিক আত্মঘাতী কাজ থেকে বিরত রাখে। ইসলামে আত্মহত্যাকে কবিরা গোনাহ বা জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত করেছে। সব ফকিহবিদ এবং চার মাজহাবের ইমামরা আত্মহত্যাকে হারাম ফতোয়া দিয়েছেন। বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। এবং যে-কেউ জুলুম করে অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্যই আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করব। আল্লাহর পক্ষে তা সহজসাধ্য।’ (সূরা নিসা : ২৯-৩০)। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ছাবিত বিন জিহাক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো বস্তু দিয়ে নিজেকে হত্যা করবে, কেয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দিয়েই শাস্তি প্রদান করা হবে।’ (বোখারি : ৫৭০০)। হাদিসে আরও উল্লেখ হয়েছে, জাবের বিন সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) এর সমীপে এক ব্যক্তিকে আনা হলো, যিনি নিজেকে তরবারির ফলা দিয়ে হত্যা করেছে। ফলে তিনি তার জানাজা পড়ালেন না। (মুসলিম)। এছাড়াও হাদিসে আত্মহত্যাকারীর শাস্তি সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে।
বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি মুহাম্মদ (সা.) হাদিসে আত্মহত্যা থেকে পরিত্রাণের উপায়, পদ্ধতি এবং এর পরিণাম ও ভয়াবহতার বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে এবং মুহাম্মদ (সা.) কে অনুসরণ করে, তার পক্ষে এরূপ আত্মঘাতী অন্যায় কাজ করা সম্ভব নয়। আতিয়্যাহ ইবনে উরওয়াহ সাদি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং শয়তানকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আগুন পানি দ্বারা নেভানো যায়। যখন তোমাদের মধ্যে কারও রাগ আসে তবে সে যেন অজু করে।’ (আবু দাউদ)। অপর বর্ণনায় আছে, আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কারও রাগ বা ক্রোধ হয়, সে যেন বসে পড়ে। তাতেও রাগ না কমলে সে যেন চিত হয়ে শোয়ে পড়ে।’ (সুনান আহমদ)।
মানুষের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো আদর্শের অনুসরণ করা। ব্যক্তিজীবনে মানুষ যে আদর্শ বা ধর্মকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে, তার পক্ষে এর নীতি-নিয়মের বিপরীত কাজ করা খুবই কঠিন। তবে যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের দেশে শতকরা ৯৫ ভাগ ধর্মপ্রাণ মানুষ বসবাস করা সত্ত্বেও কেন এত অনৈতিক কর্মকা- প্রতিনিয়ত ঘটছে? এর কারণ কী? এর অন্যতম কারণ হলো, শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ ধর্মের পরিচয় দেয়; কিন্তু শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ ধর্মের অনুসরণ করে না। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ ধর্মীয় নীতি-আদর্শের অনুসরণ করছে। এ ২৫ ভাগ মানুষ থেকে কখনও রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক অঙ্গনে অনৈতিক কাজ প্রকাশিত হয় না। এসব মানুষই প্রকৃত শিক্ষিত ও ধর্মের অনুসারী।
জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যা রোধ করতে হলে অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রে ও দেশব্যাপী ইসলামি আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে সব স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে ধর্মীয় শিক্ষা আবশ্যকীয় করতে হবে। এতে মানবজীবনে মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা, আত্মপরিচয় বোধ অর্জন হবে। ফলে প্রতিষ্ঠিত হবে আত্মহত্যামুক্ত নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন

1,388 total views, 7 views today